পণ্যের মানোন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্বে নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে এবং বাজার খুঁজতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কী চাহিদা আছে, সেটা আমাদের জানতে হবে। সেই চাহিদা অনুযায়ী আমাদের দেশের কোন কোন পণ্য রপ্তানি বা উৎপাদন করা সম্ভব, প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব এবং রপ্তানি আমরা করতে পারি, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’
শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এ মেলায় দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পরিচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়- মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ আয়োজনে বাণিজ্য বৃদ্ধিরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ধরণের আয়োজনের ফলে উৎপাদিত পণ্যের মান বৃদ্ধিরও সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শেখ হাসিন বলেন, তাঁর সরকার ব্যবসা করতে আসেনি। এ কাজটি ব্যবসায়ীদের। সরকার শুধু ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যবসা হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক ও মানসম্পন্ন। আমাদের অবশ্যই গ্রাহকদের সর্বোচ্চ মানের পণ্য ও সর্বোচ্চ সেবা দিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী পণ্যের মান, ব্র্যান্ড এবং উত্পাদন সম্পর্কে বিশেষ সতর্ক থাকতে উত্পাদকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডে পণ্য রপ্তানি করতে পারলে তা আমাদের জন্য সহজ ও লাভজনক হবে। এতে রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিদেশে আমাদের পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাবে।’ তিনি দেশের প্রচলিত কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘বিদেশে কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে আমাদের প্রচলিত ও অপ্রচলিত কৃষিপণ্যের জন্য নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে।’
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা মাছ প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। শুধু বিদেশে কেন, দেশেও প্রক্রিয়াজাত মাছের বাজার আছে।’ মুসলিম দেশগুলোতে ‘হালাল’ মাংসের চাহিদার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘মাংস প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতে পারব না কেন?’ ফুল রপ্তানি নিয়েও উদ্যোক্তাদের সামনে একই প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ উত্পাদন ও রপ্তানিতেও গুরুত্ব দেন।
মানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনা, উত্পাদিত পণ্যের মান উন্নয়নের জন্য গবেষণা ও সমীক্ষা চালানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘রপ্তানির বহুমুখীকরণ হলে আমরা উত্পাদন আরো বৃদ্ধি করতে পারব।’ বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশিদের ধারণা পাল্টে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে একসময় করুণার চোখে দেখত, তারাই এখন বাংলাদেশের প্রশংসা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে। চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ার বিষয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ভালো করছে তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু উন্নত দেশের চেয়েও ভালো করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের শেষ বছরে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, যা বর্তমানে এক হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের শেষ বছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। আমরা তা কমিয়ে ২২.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। ২০০৬ সালে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.২ শতাংশ। তা এখন কমে ৭.৯ শতাংশে নেমে এসেছে।’
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান রপ্তানির প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান করে নিতে পারবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রপ্তানিকারক, গবেষক ও দেশি-বিদেশি প্রযুক্তবিদরা সর্বাধুনিক ধ্যান-ধারণা ও প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে আসবেন।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্যসচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমেদ বক্তব্য দেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক নেতারা এবং মেলায় দেশ-বিদেশের অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

