গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
ড. কামাল বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে দলীয়করণের মাধ্যমে।’ কোন দল নির্বাচনে ৩০০ আসন পেয়ে থাকলেও কোনো অযোগ্য লোককে নিয়োগ দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সুজন আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো দিন রাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে না। অনেক মূল্য দিতে হয়েছে এ দেশের সংবিধানের জন্য।’
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আইন ও বিচারের উন্নয়নের চেয়ে দেশে মাছ ও পশুর উন্নয়নের জন্য প্রায় আড়াই গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। গত অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩২৯ কোটি টাকা। অপরদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৭৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আইন ও বিচার ক্ষেত্রের উন্নয়নের চেয়ে দেশে মাছ ও পশুর উন্নয়নের জন্য প্রায় আড়াই গুণ বেশি খরচ হচ্ছে।’
শাহদীন মালিক বলেন, ‘রাজধানীর মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারের কিছু বাড়তি কাজ করার জন্য অতিরিক্ত ৪৩০ কোটি টাকার বর্ধিত ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে। অর্থাৎ ১ কিলোমিটার বর্ধিত ফ্লাইওভারের খরচ সারা বছরের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সব উন্নয়ন কাজের বরাদ্দের চেয়ে ঢের বেশি।’
এ সময় তিনি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় বাজেটে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
শাহদীন মালিক বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে ব্যর্থ। দুদক সরকারি দলের দুর্নীতি দেখতে পায় না। সংসদ আছে, তবে তার কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আর আইনের শাসন না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জনগণের কল্যাণ আনতে পারে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘যে মুহূর্তে আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছি, সেই মুহূর্তে এ দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারটুকু নেই।’
তিনি বলেন, একজন বিচারপতি অবসর নেওয়ার পর প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে কথা বলছেন। তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হচ্ছে না। এদিকে সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী আদালতকে চ্যালেঞ্জ করে কটূক্তি করেছেন, তবু তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়নি শুধু সরকারি দলের অনুসারী হওয়ায়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে বিচারব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে পুলিশের কাছে মানুষ আইনের আশ্রয় নেয়, তারা আজ মানুষ পোড়ানোর মতো অপরাধ করছে। আমি জানি না পরিবারটি সঠিক বিচার পাবে কি না।’
বর্তমান বিচারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার- এ কথা উল্লেখ করে বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘যে বিচারব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, সেখানে শুধু ক্ষমতাসীনরা সুবিধা পেয়ে থাকে, আর দুর্বলরা অবহেলিত হয়ে থাকে। তাই বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকলে সাধারণ জনগণের সঠিক অধিকার আদায় সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আয়োজক সংগঠন সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রমুখ।

